বিবিপি নিউজ: কথাটি প্রথমে শুনলে মনে খটকা লাগাটা স্বাভাবিক। ক্যান্সার ট্রেন! কি সেটা ? এমন প্রশ্ন জাগতেই পারতে। তবে পুরো বিষয়টি জানতে পড়তে থাকুন।
পাঞ্জাব রাজ্য ভারতের কৃষি রাজ্যের মধ্যে অন্যতম। আর সেই রাজ্যের এক প্রদেশে অবস্থিত ভাটিন্ডা শহর। সেই শহরের মতোই অখ্যাত সেখানকার রেলস্টেশন। কিন্তু রাত ৯টা বাজতেই প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠে। কারণ প্রতিদিন রাত প্রায় ৯.৩০ মিনিট-এ ভাটিন্ডা রেল ষ্টেশন থেকে একটি ট্রেন ছেড়ে যায় রাজস্থানের বিকানের শহরের উদ্দেশ্যে। ভারতীয় রেলওয়ের দেওয়া নাম ও নাম্বার হলো আবোহার যোধপুর প্যাসেঞ্জার-৫৪৭০৩। কিন্তু স্থানীয় লোকজন এখন আর ট্রেনটিকে সেই নামে ডাকেন না। ট্রেনটি এখন সবার কাছেই অধিক পরিচিত ক্যান্সার ট্রেন নামে।৫৪৭০৩ নম্বর ট্রেনটির এমন নামকরণের পেছনে আছে এক করুণ কাহিনী।
জানা যায়, ট্রেনটি প্রতিদিন প্রায় ৬০-১০০ জন ক্যান্সার রোগী ও তাদের পরিবার সহ প্রায় দুই শতাধিক যাত্রী বহন করে নিয়ে যায় রাজস্থানের বিকানের শহরে। রোগীদের সবাই বিকানেরের একটি আঞ্চলিক ক্যান্সার হাসপাতালে যান চিকিৎসা নিতে। এদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা নিয়মিত এই ট্রেনে যাতায়াত করেন চিকিৎসার প্রয়োজনে।প্রতিদিন রাত প্রায় সাড়ে নয়টায় ট্রেনটি ছেড়ে যায় ভাটিন্ডা ষ্টেশন এবং ভোর ছয়টার দিকে পৌঁছায় বিকানের ষ্টেশনে। ৪৪ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা গতির ট্রেনটির এই যাত্রার মাঝখানে আছে ২৬টি বিরতি। অনেক দিন এমনও হয় ট্রেনটি নির্দিষ্ট সময় থেকে দুয়েক ঘন্টা দেরিতে পৌঁছায়। জানা যায়, মোট যাত্রীর ৬০ ভাগই বিভিন্ন বয়সের ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী। গত এক দশকে এই কারণেই ট্রেনটি লাভ করেছে ক্যান্সার ট্রেন নামক কুখ্যাতি। ১২ কোচের এই ট্রেনটিতে পাঞ্জাব প্রদেশের প্রায় সব অঞ্চল থেকেই রোগীরা মূলত বিকানের যাওয়ার জন্য জড়ো হন। ট্রেনটি প্রতিদিনই তার ধারণ ক্ষমতার সর্বোচ্চ সংখ্যক যাত্রী নিয়ে চলাচল করে। টিকেটের মূল্য ২১০ টাকা হলেও রোগীদের কাছ থেকে কোনো দাম নেওয়া হয় না এবং রোগীর সাথের একজন পরিজন টিকিটের দামের উপর পঁচাত্তর শতাংশ ছাড় পান। ট্রেনটিতে মাত্র একটি স্লিপার কম্পার্টমেন্ট আছে যাতে যাত্রীরা শুয়ে শুয়ে যাতায়াত করতে পারেন। বাকি সব কম্পার্টমেন্ট 'সাধারণ' ক্যাটাগরির যাতে জায়গা পেতে মোটামুটি যুদ্ধ করতে হয়।
পাঞ্জাবের ভাটিন্ডা থেকে রাজস্থানের বিকানের এর দূরত্ব প্রায় ৩২৫ কিলোমিটার, আট ঘন্টার এক লম্বা সফর - কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন অসুস্থ শরীর নিয়ে এভাবে লোকজন বিকানের এর দিকে ছুটে যাচ্ছে?
এই যাত্রার একমাত্র কারণ বিকানেরের আচার্য তুলসী রিজিওনাল ক্যান্সার ইন্সটিটিউট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের বিনামূল্যের চিকিৎসা এবং ন্যায্য মূল্যের ঔষধপত্র। দেখা গেছে, ৫৪৭০৩ নাম্বার ট্রেনটির ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের বেশীরভাগই দক্ষিণ পাঞ্জাবের সাধারণ কৃষক অথবা খেটে খাওয়া গরীব মানুষ। যাদের চিকিৎসার খরচ জোটাতে হিমশিম খেতে হয়। এজন্যই কেউ জমি বেচে আর কেউ ধার দেনায় মিটিয়ে চলেছেন ব্যয়বহুল এই চিকিৎসার খরচ। এখন প্রশ্ন হলো, পাঞ্জাবে কি তবে ক্যান্সার চিকিৎসার কোনো সুব্যবস্থা নেই? উত্তরে বলা যায়, আছে। ক্যান্সারের চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদী। পাঞ্জাবের অনেক হাসপাতালেই বিশেষায়িত ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে তবে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এটি বিবেচনায় নিয়েই পাঞ্জাব সরকার চালু করেছে, মুখ্যমন্ত্রী পাঞ্জাব ক্যান্সার রাহাত কোষ স্কিম (MMPCRKS); যা থেকে ক্যান্সার রোগীদের নগদ আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ আছে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যাতিরেকে এই সাহায্য পাওয়া ভীষণ কঠিন। তাছাড়াও, চিকিৎসা ব্যয় বেশি হওয়া এবং সরকারি হাসপাতাল গুলোতে গরীব রোগীদের প্রতি অবহেলা করা সহ অনেক অভিযোগ পাওয়া যায় খোদ রোগীদের কাছ থেকেই।
আচার্য তুলসী রিজিওনাল ক্যান্সার ইন্সটিটিউট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার ভারতের ১৯টি আঞ্চলিক ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারগুলোর মধ্যে অন্যতম। পাঞ্জাব সরকারের মুখ্যমন্ত্রী পাঞ্জাব ক্যান্সার রাহাত কোষ স্কিমের আওতাধীন এই হাসপাতালে বিনামূল্যে ক্যান্সারের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয় এবং স্বল্পমূল্যে ঔষধপত্র দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিকানেরে থাকা খাওয়ার খরচও তুলনামূলকভাবে কম। যেকোনো ধর্মশালায় একটি কক্ষ ৫০ টাকা এবং ৫ টাকা হাসপাতালের ক্যান্টিনে খাবারের বন্দোবস্ত রয়েছে। এইসব কারণে রোগীদের জন্য হাসপাতালটি হয়ে উঠেছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং ভরসার জায়গা।
সূত্র: ভারতীয় রেলওয়ে এবং রোয়ার বাংলা।
