বিবিপি নিউজ, মনি ভট্টাচার্য: জল্পনা-কল্পনা শেষে তৃণমূলের কাননের ফুল হয়ে ফুটলেন প্রতীক উর রহমান। সদ্য অর্থাৎ গত সোমবার সিপিআইএম(CPIM) দলের রাজ্যের সোশ্যাল গ্রুপে সমস্ত দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ চেয়ে তিনি পত্র লেখেন। তারপর থেকেই কানাঘুষো শুরু হয়, দিন দুয়েক বিষয়টি অত্যন্ত ঝাপসা মনে হলেও বিষয়টি যে পূর্ব পরিকল্পিত এমন গুঞ্জন উঠেছিল দলের অন্দরেই।
প্রিম্যাচিউর পর্যায়ে সিপিআইএম দলটির আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন না তুললেও রাজ্যে সাধারণ সম্পাদককে অর্থাৎ মহ: সেলিমকে ধুয়ে দেন প্রতীক উর। একাধিক ইস্যু যেমন, কেন চিঠি বাইরে এল, কেন সে সাইড কর্নার, প্রশ্ন তুলেছি বলে টার্গেট, ইত্যাদি-ইত্যাদি। কিন্তু রেজিমেন্টেড দল অর্থাৎ সিপিআইএমের দলীয় স্বভাব চরিতার্থ বা পড়াশুনা করতে গিয়ে আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে বুঝে গিয়েছিলাম যে এলসি মেম্বাররা জানেন তার দলে সদস্যদের বাড়িতে কি রান্না হচ্ছে বা তিনি বাজারে কি কিনেছেন, এই সমস্ত আর কি।
এত খবর রাখা সত্ত্বেও ২০২১ বিধানসভা, ২০২৪ লোকসভায় প্রার্থী হওয়া, এসএফআই (SFI) রাজ্য সাধারণ সম্পাদক হওয়া প্রতীক উর রহমান তলে তলে কি করছেন সেটা তাঁরা জানতেন না ? এটা বিশ্বাস করতে একটু সমস্যাও হচ্ছে। যাই হোক দিন এগোতেই লক্ষ্মীর ভান্ডার, বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূলের লড়াই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুপ্রিম কোর্টে SIR প্রশ্নাবলী, এই ধরনের স্তুতি প্রতীকের গলায় শোনা যেতেই থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ব্যক্তিরা বুঝে গিয়েছিলেন জোড়া ফুলে প্রতীক ফুটতে শুরু করে দিয়েছে। এরই মধ্যে রাজ্য জুড়ে চরম জল্পনা। সাংবাদিক থেকে বিরোধীরা, সবাই অন্তত সরব, কেউ প্রতীকের পক্ষে কেউ দলের আদর্শের পক্ষে। উভয়ই ভাইস-ভার্সা বজায় রেখেছেন এটাও সত্য। ফলে সামাজিক মাধ্যমে মত অনেক থাকলেও অনেক বাম মনস্ক ব্যক্তিরা মনে করেছিলেন, বাম মতাদর্শ ভুলে প্রতীকের মত নেতা অন্তত অন্য দলে যাবে না। ততক্ষনে ব্যক্তিগত জীবন টানা হিঁচড়ে শুরু হয়ে গেছে প্রতীকের। যদিও প্রতীকের সঙ্গে বসতে বিমান বোস একাগ্রচিত্তে চেয়েছিলেন। কিন্তু মহ সেলিম তখনও চুপ ছিলেন। নীরবতা ভাঙলেন যখন, ততক্ষণ বাম-ডান, রাম-রহিম সব পক্ষই বুঝে গিয়েছিলেন যে খেলা ঘুরে গেছে, তিনি বললেন, 'এরকম তেজি ঘোড়ার দলত্যাগ হওয়ার বেদনা সন্তানবিয়োগের মত,' অথচ তিনি প্রতীকের সঙ্গে বসতে চাইলেন না।
মহানগরের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ব্যক্তিরা বলছেন, যে অভিযোগ প্রতীক সেলিম বাবুদের বিরুদ্ধে করছিলেন, প্রতীকের ফুল ফোটা আঁচ করতে পেরেই, প্রতীক ইস্যুতে মুখ খুলে খুব সন্তর্পনে নিজেকে সেফ সাইড করে নিয়েছেন তিনি। যদিও সেলিমবাবু প্রতীকের সঙ্গে বসতে চাইলেও প্রতীক বসতেন কিনা সন্দীহান রাখছি তার অন্যতম কারণ, বর্তমান সময় সাপেক্ষে তৃণমূলে যোগদান একদিনে ঠিক করেন নি সেলিমের এই 'তেজি ঘোড়া', সেক্ষেত্রে নতুন দলের সঙ্গে বেইমানি যে করবে না প্রতীক সেটা বোঝাই যাচ্ছিল তার গতিবিধিতে। সব জল্পনা শেষে প্রতীক যখন আমতলায় তৃণমূল অফিসে পৌঁছল তড়িঘড়ি প্রতীককে বহিস্কার করতে আদেশপত্র লিখতে বসেন লাল শিবিরের নেতৃত্ব। হলও তাই, বিকেল থেকে মানুষের মনে দুটো উইন্ডো কাজ করল, বাম মতাদর্শের প্রাক্তন নেতা প্রতীকের গলায় 'জয় বাংলা' ও বহিষ্কারের খবর একই সঙ্গে দেখতে থাকল বঙ্গ। প্রসঙ্গত, কোনো পক্ষের কিছুতেই যে যায় আসে না, সেটাও ইতিমধ্যে নেতৃত্বরা বুঝিয়ে দিয়েছেন।
যদিও প্রতীকের মত, ' বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে, বিজেপিকে আটকাতে, তৃণমূলে, অভিষেক ও মমতার সঙ্গে । ' যদি সেটুকুই হবে তবে নির্বাচনের আগেই কেন, এই প্রশ্নও তুলছে প্রতীকের প্রাক্তন সতীর্থরা। প্রতীক কিন্তু আরও একধাপ এগিয়ে কান্তি গাঙ্গুলি কেন তেলের টাকা পান না, বৃদ্ধ হলে প্রতীকের ভবিষ্যৎ কি এসব আলোচনাও সেরে ফেলেছেন। ভবিষ্যৎ ভাবনা কখনও খারাপ নয় ঠিকই। কিন্তু যে মতাদর্শের দল তিনি করেছেন এতদিন, তারাই আবার বলছেন, 'লোভে পড়েই নাকি তৃণমূলে গেছেন প্রতীক' এক্ষেত্রে বাম মতাদর্শ নিয়ে, বা বাম নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে কোনও লাভ নেই বলেই বোধ করি। কারণ, এটুকু যেমন স্পষ্ট যে বাম দলের অন্দরে সমস্যা আছে, ঠিক তেমনই প্রতীক দল বদল করবে নেতৃত্বরা জানত বলেই বসতে চায় নি।
এসবের মধ্যে আবার কিছু বিদ্ধজনেরা বলছেন, কেন শুন্য পাওয়া দলের কাউকে ভাঙিয়ে নিতে হচ্ছে তৃণমূলকে ? সে সব প্রশ্ন যেন না ওঠে তাই আগে ভাগেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলে রেখেছেন, 'প্রতীক ভালো ছেলে, ব্যক্তি আক্রমন করেন না, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে আমরা এক, ইত্যাদি ইত্যাদি, অর্থাৎ কারণ টা স্পষ্ট করেছেন আরকি। ফলত, তৃণমূলের কাননে প্রতীক ফুটলেও গুঞ্জন ওই মহলেও, অভিষেক বাবু বলেছেন, প্রতীক নাকি বলেছেন, টিকিট দিলেও দাঁড়াতে চায় না সে। ওদিকে তৃণমূলীয় গুঞ্জন যে ডায়মন্ড হারবার, মগরাহাট, বা যাদবপুর কেন্দ্রের যে কোনও একটি বিধানসভার টিকিট পকেটে পুরেই নাকি তিনি তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। এসবের সত্যতা যাচাই করার ক্ষমতা আমার অবশ্য নেই। কিন্তু হিসেব বলছে ২০২১ বিধানসভায় বামদের প্রার্থী প্রতিকুর সর্বসাকুল্যে ভোট পেয়েছেন ৩৮ হাজার, ২০২৪ লোকসভায় ভোট পেয়েছেন ৮৪ হাজার, অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কতটা সফল তা নিয়ে প্রশ্ন চিহ্ন থাকলেও প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত ব্যর্থ না বললেও সফলতার তেমন প্রমান তিনি দিতে পারেন নি। এতদিন সিপিআইএমে থাকা প্রতীক উরের মূল্য ছিল রেজিমেন্ট দল হিসাবেই, কিন্তু রুলিং পার্টিতে যোগ দিয়ে যে রাজনীতি তিনি আশা করছেন, বা করবেন বলে দাবি করেছেন, তা কতটা পারবেন তা নিয়েও প্রশ্ন থাকবে। প্রতীক বদলের সমীরকন যেমন ই হোক, তা বিধানসভার টিকিট হোক কিংবা ক্যারিয়ার হোক, কিংবা মতাদর্শ হোক, বড়জোর বিজেপিকে(BJP) রুখে দেওয়া হোক, একটা বিরাট প্রশ্ন চিহ্ন প্রতীক উরের দিকে ধেয়ে আসছে, 'বাম থেকে কিছুটা হলেও ডান পন্থায় গিয়ে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে কী পলিটিক্যাল সুই*সা*ইডের মুখে ঠেলে দিলেন তিনি?' উত্তর বলবে কেবল সময়।


