মৈত্রীর বন্ধন. - BBP NEWS

Breaking

বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৯

মৈত্রীর বন্ধন.

তমা কর্মকার

              মা এবার আমায় একটা সুন্দর দেখে রাখী কিনে দাও |বারো বছরের লিপির কথা শুনে লিপির মা সুষমা বলল |তু্ই রাখী দিয়ে কি করবি মা? তোর তো কোন ভাই নেই? লিপি বলে মা আমি স্কুলে পড়েছি এখন রাখী পড়াতে কোন ভাই লাগে না |রাখী সবাই কেই পড়ানো যায়| রাখী মানে তো মৈত্রীর বন্ধন |আর তাছাড়া তো আমার একটা ও ভাই আছে |লিপির মা অবাক হয়ে বলে সেকি? কে তোর ভাই? আমাদের তো কোন ছেলে নেই আর তোর বাবাও একা আমিও একা তাই তু্ই বংশের একমাত্র মেয়ে তোর আবার ভাই কোথা থেকে এলো? লিপি বলল কেন মা? আব্দুল  ভাই তো আছে |লিপির মা লিপির কথা শুনে আঁতকে উঠে বলে |সেকি ওতো মুসলমান ও তোর ভাই হলো কিভাবে? আর ওর হাতে রাখীই বা বাঁধবি কি? লিপি মাকে বলে মা তাহলে তো তুমিও তো মুসলমান |লিপির মা একথা শুনে বলে কিসব আজে বাজে কথা বলছিস লিপি |আমি তো হিন্দু আমি কেন মুসলমান হতে যাব |লিপি বলে কারণ তিন মাস আগে যখন তুমি বাথরুমে পরে গিয়ে তোমার মাথা ফেটে অনেক রক্ত ক্ষরণ হয়ে ছিল তখন হাসপাতালে ডাক্তার বাবু বলেছিলো তোমার রক্তের প্রয়োজন তোমাকে রক্ত না দিলে তোমাকে বাঁচানো যাবে না |তোমার রক্ত ও নেগেটিভ গ্ৰুপ হওয়ার জন্য কোথাও পাওয়া যাচ্ছিলো না |বাবা ও বাড়ীর সবাই যখন কি করবে এই ভাবনায় অস্থির পরে |তখন দেবদূতের মতো আব্দুল  ভাই নিজে থেকে এগিয়ে এসে তোমায় রক্ত দিতে চায়| বাবা ও বাড়ীর সবাই তোমার প্রাণ বাঁচাতে সানন্দেই রাজী হয়ে যায় আর আব্দুল ভাই ও তোমায় নিজের শরীর থেকে রক্ত দেয় |একজন মুসলমানের রক্তে তুমিও তো একজন মুসলমান হয়ে গেছো তাই না মা |তুমি যেহুতু জাত মানো তাই এতো দিন বাড়ীর কেউ তোমায় এই সত্যি কথাটা বলেনি |মা আজ আমি তোমায় এই চরম সত্যিটা বললাম |তুমি শুধু একটা মা নও |যে আব্দুল ভাই রক্ত দিয়ে তোমার প্রাণ বাঁচিয়েছে |তোমার মনে নেই দেশ মা ভারত বর্ষ যখন পরাধীন ছিল তখন কি শুধু হিন্দু ভাইরা প্রাণ দিয়ে দেশ স্বাধীন করে ছিল মুসলিম ভাইরা কি দেশ স্বাধীন করতে প্রাণ দেয়নি? তবে কেন মাগো জাতের বিচার করো, কেন ওদের এখনো অবহেলা করো জাতের নামে |মাগো তুমি কি ভূলে গেছো কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত লেখা |

মোরা একই  বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু .মুসলমান
মুসলিম তার নয়ন মনি হিন্দু তাহার প্রাণ ||
এক সে আকাশ মায়ের কোলে /যেন রবি শশী -দোলে,
এক রক্ত বুকের তলে এক সে নারীর টান ||

মোরা এক সে দেশের খাইগো হাওয়া, এক সে দেশের জল,
এক সে মায়ের বক্ষে ফলে একই ফুল ও ফল |
এক সে দেশের মাটিতে পাই /কেউ গোড়েকে শ্মশানে ঠাঁই,
মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু -মুসলমান

মোরা এক ভাষাতে মাকে ডাকি, এক সুরে গাই গান ||
চিনতে নেরে আঁধার রাতে করি মোরা হানা হানি,
সকাল হলে হবে রে ভাই ভায়ে ভায়ে জানাজানি |কাঁদব তখন গলা ধ'রে /চাইব ক্ষমা পরস্পরে,
হাসবে সে দিন গরব ভরে এই হিন্দুস্থান ||

লিপির মা লিপির কথা শুনে কেঁদে ফেলে বলে |সত্যি লিপি তু্ই কত বড়ো হয়ে গেছিস |যে কথা গুলি তোরা ছোটরা বুঝিস সেই কথা গুলি কেন আমরা বড়োরা বুঝতে পারি না |ধন্য তু্ই আশীর্বাদ করি আরও বড়ো ও উচ্চ মনের  মানুষ হ  |আর তু্ই শুধু একা নয় আমি ও তোর বাবা তিন জনে মিলে, আব্দুলদের বাড়ী গিয়ে শুধু আব্দুল কে নয় ওদের গোটা পরিবারকে নিমন্ত্রন করে আসবো |সেই মতো লিপি ও ওর বাবা মা একসাথে আব্দুলদের বাড়ী গিয়ে আব্দুল দের  পরিবারের সবাইকে রাখীর নিমন্ত্রণ করে আসে |আব্দুল রাও আনন্দের  সাথে পনেরই আগস্ট স্বাধীনতা ও রাখীর দিন একসাথে হওয়ায় পনেরই আগস্ট লিপিদের বাড়ী আসে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে |  লিপির মা নিজের হাতে অনেক রকমের মেনু রান্না করে আব্দুল দের খাওয়ায় |আর লিপি রাখী পরিয়ে দেয় আব্দুলের হাতে | আব্দুলের হাতে রাখী পরিয়ে দেবার সময় লিপি যেন শুনতে পেল স্বাধীনতার জাতীয় পতাকা উচ্চ আকাশে উড়তে উড়তে বলছে এভাবেই মৈত্রটা রক্ষা করে চলো তাহলেই সার্থক হবে আমার মাতৃত্বের আঁচল ওড়ানো |

Pages