সাধারণ কথাই যেন অশ্লীল শব্দ, মৃত্যুমুখে ভোজপুরি ভাষা - BBP NEWS

Breaking

শনিবার, ৫ আগস্ট, ২০২৩

সাধারণ কথাই যেন অশ্লীল শব্দ, মৃত্যুমুখে ভোজপুরি ভাষা

 





‘কোমরিয়া করে লপালপ, কি ললিপপ লাগিলু’ কিংবা ‘রাজা রাজা রাজা করেজা মে সামাজা...’


কেবল এইটুকু বললেই কি মনে পড়ে? ভয়ংকর জগঝম্প বাজনা আর শরীরী বিভঙ্গের হিল্লোল। হ্য়াঁ, ভোজপুরি গানের এমন অসংখ্য নিদর্শনের সঙ্গে আমরা সকলেই পরিচিত। কোনো পিকনিক কিংবা পুজার ভাসান অথবা যে কোনো হুল্লোড়ের অনুষ্ঠানে এই ধরনের গান শোনা যায়।


 পূর্ব উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিম বিহারের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ কথা বলেন ভোজপুরি ভাষায়। এই দুই রাজ্যের একটা বড় অংশই পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে দেশের নানা প্রান্তে। এমনকি অন্যান্য দেশেও। কিন্তু ভোজপুরি বললে এসব নয়, প্রথমেই মনে পড়ে যায় এমন এক ধরনের গান, যাকে ‘অশ্লীল’ বলেই কালি মাখাতে চায় সমাজের এক বিরাট অংশ। জানেন কি, স্রেফ এই অপবাদ ও সমালোচনার ছোবলেই একটু একটু করে ‘নাই’ হয়ে যাচ্ছে ভাষাটি।


সংস্কৃত নাকি মৈথিলী—কোন ভাষা থেকে জন্ম ভোজপুরি ভাষার? এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। যথেষ্ট প্রাচীন এই ভাষা। কিন্তু মানুষ বা অন্য জীবের মতো ভাষাও মরে যায়। বহু বিশেষজ্ঞেরই আশঙ্কা আগামী একশ বছরে নাকি নব্বই শতাংশ ভাষা মারা যাবে! হয়ত এমন দাবিতে অতিশয়োক্তি থাকতে পারে। কিন্তু শতাংশের হিসেবটা যদি কমও হয়, তাহলেও মানতেই হবে পরিস্থিতি যথেষ্ট বিপজ্জনক। বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎও যে খুব সুরক্ষিত নয়, তাও বলাই বাহুল্য। তবে এখানে আমরা ভোজপুরি ভাষা প্রসঙ্গেই থাকব।



শোনা যাচ্ছে, পরিস্থিতি এমনই দাঁড়িয়েছে ভোজপুরির একটা সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অবনমন ঘটেছে ওই ধরনের গানের সূত্রে। ফলে শিক্ষিত ভোজপুরি ভাষাভাষী মানুষরা আর সেই ভাষায় কথা বলছেন না। হিন্দি বা অন্য কোনো ভাষায় কথা বলা শুরু করছেন। আশঙ্কা, এমনটা চলতে থাকলে ভোজপুরি ভাষা মূলত অশিক্ষিত ও কর্মহীন মানুষের মুখের ভাষা হয়েই থেকে যাবে।



এমন নয়, শিক্ষিতরা ভোজপুরি গান শোনেন না বা কিংবা উপভোগ করেন না। গানের ‘বিট’ তাদেরও মজা দেয়। পার্টিতে কোমরও দুলে ওঠে। গানের ‘রসাল’ লিরিক্স নিয়ে চর্চা করে বন্ধুমহলে। কিন্তু বিষয়টা ওখানেই থেমে যায়। ভোজপুরি ভাষার আর কোনও অস্তিত্ব তাদের জীবনচর্চায় নেই। ফলত ক্রমশই ওই বিশেষ ধরনের গানের চারপাশেই যেন বাঁধা পড়ে যাচ্ছে ভোজপুরি ভাষা। বিপন্ন হচ্ছে তার অস্তিত্ব।


কিন্তু কেন এত জনপ্রিয় ভোজপুরি গান? এমন তো নয়, তথাকথিত ‘অশ্লীল’ গান কেবল ভোজপুরি ভাষাতেই তৈরি হচ্ছে। বলিউডে ‘চোলি কে পিছে ক্যায়া হ্যায়’, ‘সরখাইলে খাটিয়া’ কিংবা ‘অঙ্গনা মে বাবা’র মতো গানের অভাব নেই। টালিগঞ্জেও ‘যতই ঘুড়ি ওড়াও রাতে’, ‘লুচি লুচি ফুলকো লুচি’র মতো গান অনেক পাওয়া যাবে। এমন নিদর্শন দেশের সব ভাষার গানের ক্ষেত্রেই পাওয়া যাবে। এই ধরনের গানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগটা কমন। প্রায় সব গানেই নারীকে ‘যৌন বস্তু’ হিসেবে দেখানো হয়। নরনারীর প্রেমকে কেন্দ্র করে ইঙ্গিতবাহী শব্দ ব্যবহার করে শরীরী মিলন কিংবা নারী, পুরুষের গোপনাঙ্গের বর্ণনাও আকছার মেলে। ভোজপুরি গানে মূলত এই একই ধাঁচকে লাগাতার অনুসরণ করে যাওয়া হচ্ছে।


তার সঙ্গে সঙ্গেই লক্ষ করলে দেখা যাবে ‘কাটোরা’ (বাটি), ‘ঝাড়ু’ (ঝ্যাঁটা), ‘ললিপপ’, ‘তালা’র মতো সহজ ও সারাক্ষণ ব্যবহৃত অত্যন্ত চেনা শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে গানের লিরিক্সে। এগুলো সবই নারীর (এমনকি পুরুষেরও) গোপনাঙ্গের ইঙ্গিতবাহী। গানের বাক্যগুলোতে যে রূপক বা উপমা ব্যবহার করা হয় সেগুলোও সহজবোধ্য। ফলে একবার শুনলেই পুরোটা পরিষ্কার হয়ে যায়। তাছাড়া গায়কি ভঙ্গিতেও কার্যতই কামার্ত একটা স্বর ব্যবহার করা হয়। সব মিলিয়ে সুরের চটক ও কথার গমকের দুরন্ত রসায়ন খুব দ্রুত শ্রোতাকে বশ করে ফেলে।


গানের পরিবেশন এমনই, আপনি মনে মনে কখনোই ভাবতে পারবেন না লাদাখের হিমেল পরিবেশ কিংবা কোনো ঝাঁ চকচকে শহুরে আবহে এই গানের দৃশ্যায়ন সম্ভব। ভিডিওগুলোতে চোখ রাখলেই ধরা পড়বে কোনো খেত কিংবা গ্রামীণ পরিবেশেই সেগুলি শুট করা হয়েছে। তবে ভোজপুরি গান কিন্তু মোটামুটি একটা যৌনতার ফ্রেমের মধ্যেই সবটা ধরে। সুড়সুড়ি দেওয়াই সেখানে মুখ্য উদ্দেশ্য। গানের কথার অশ্লীলতার সঙ্গে ‘বিট’ মিশে একটা মাদকতা তৈরি করে। আর সেইটুকুই উদ্দেশ্য।


মূলত একটি স্থানিক ভাষা হয়েও ভোজপুরের ভারতবর্ষজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে পরিযায়ী শ্রমিকদের অবদান কম নয়। আর এভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ভোজপুরি গানগুলোও। ফলে সামগ্রিকভাবেই ‘ভোজপুরি সংস্কৃতি’ বললে এই চটক আর যৌন ইশারার কথাই বোঝে সকলে। ব্যাপারটা এমন দাঁড়াচ্ছে, গানগুলোর জনপ্রিয়তাতেই ভোজপুরি ভাষা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। তেমনটাই দাবি ওয়াকিবহাল মহলের।


এই খবরটি 'বিবিপি নিউজ নেটওয়ার্ক' সম্পাদনা করেনি। এটি নিউজ ফিড থেকে নেওয়া হয়েছে। 


Pages