মাসুদূর রহমান: ভোটের ফলাফল নিয়ে মুখরিত গোটা বঙ্গ সহ দেশবাসী। সবুজ বঙ্গে গেরুয়া ঝড়ের প্রত্যাবর্তনে নতুন হাওয়া বইছে। দুই কেন্দ্রে জয়ী শুভেন্দু অধিকারী। ঘরের মেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের কেন্দ্রেই পরাজিত হয়েছেন বিপুল ভোটে। গেরুয়া আবিরের উল্লাস থেকে শুরু করে ভাঙচুর, পার্টি অফিস দখল, বিজয়ীর আনন্দে বিজেপি কর্মী সমর্থকদের। এই সবের মাঝেও নিরবে মোবাইলের পর্দায় চোখ বুলিয়ে আবারো কাজের তদারকিতে ব্যাস্ত স্নেহা ( নাম পরিবর্তিত)। পেশায় সরকারি হাসপাতালের নার্স। কাজের ফাকে গুটি কয়েক ফোন করে একটু আধটু আপডেট নেওয়ার চেষ্টা। ব্যাস্ততার মধ্যে ফোন রিসিভ করে কথোপকথন মেরেকেটে ১/২ মিনিট। তাতেও ব্যস্ততা। কখন স্যালাইনের বিষয়ে কখনও ইনজেকশন তো আবার কখনও কোনো রোগীর ওষুধ খাওয়ানো।
গোটা বঙ্গে পালাবদলের মাঝেও একদল মানুষ নিরালস ভাবে কাজ করে চলেছেন বাড়ি থেকে দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে। কখন ঘরে ফিরবে সেটা অজানা। হাসপাতালে স্টাফদের সংখ্যাটা কম। অনেকেই ছুটি নিয়েছে। কিন্তু সবাই ছুটি নিলে লাটে উঠবে যে পরিষেবা। অগত্যা কিছু চিকিৎসকের ঘাড়ে বাড়ির দায়িত্ব। তার পাশাপাশি অর্ধেক চিকিৎসক-ই বলছি কারন নার্সেরা চিকিৎসকদের ইন্সট্রাকশন ফলো করে রোগীদের সেবা করে। এই ভোট বঙ্গে একথা বলার একটাই কারণ। স্নেহার ৫ বছরের একটা বাচ্চা বাড়িতে অপেক্ষায় রয়েছে কখন তাঁর মা বাড়িতে ফিরতে। কথায় কথায় স্নেহা আমাকে জানিয়েছে যে আজ তাঁর ডিউটি হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা বিভাগে(এনআইসিইউ)তে যেখানে আজই পৃথিবীর মুখ দেখেছে বেশ কয়েকটা শিশু। কিন্তু তাদের শারিরীক অবস্থা অতটা স্থিতিশীল নয়। কোনো এক নার্স রাস্তায় আটকে গেছে গাড়ি সঠিক সময়ে না পাওয়ায় জন্য ডিউটিতে ঢুকতে কয়েক ঘন্টা লেট হবে, অগত্যা স্নেহার ডিউটি থেকে রেহাই মেলেনি। রাত ৯ টায় তাঁর সঙ্গে আমার যখন পুনরায় কথা হয় সে চিন্তিত কিভাবে শহরতলীর কর্মক্ষেত্র থেকে মফস্বলের বাড়িতে ফিরবে। রাস্তায় ঠিকঠাক যানবাহন চলাচল করছে কি না তা জানতেই ফোন করল। যদিও গাইড দেওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম কই...! তার কিছুক্ষণ পরে পুনরায় ফোনে জানালো আজ তাঁর ফেরা হবে না, তাঁকে ওভার ডিউটি করতে হবে। কারন তাঁদের সহকর্মীরা সঠিক সময়ে পৌঁছতে পারবে না। একদিন যানবাহনের আকাল অন্যদিকে প্রকৃতির রূপ বৃষ্টি বাদল। ফলে তাঁর মা সত্বাটা ঠিক যেন কঠোর জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সে কথার ফাঁকে আক্ষেপের সুরে জানান দিলো বাচ্চার সঙ্গে একটু ভিডিও কলে কথা বলে নেব তাছাড়া আর উপায় নেই যে। আমি জিজ্ঞেস করলাম তোর বাচ্চা ঘুমাবে তো রাত্রে, সে একটু হতাশ হয়ে জানালো কাঁদতে কাঁদতে ঠিক ঘুমিয়ে পড়বে। কথাটা কোথায় গিয়ে আমার আঘাত দিল। একজন মা আরেক জন মায়ের মুখে হাঁসি ফোটাতে আরের সন্তানের শরীর ঠিক করতে নিরবে নিভৃতে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছে। আমার এই কথাটা বলার উদ্দেশ্য একটাই। এমন শত শত মা এমন শত শত বাবা-রা আজও বাড়ি থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে রয়েছেন। তাদের ডিউটি, কর্তব্যে অবিচল। তারা নিরালস ভাবে সম্পন্ন করে চলছে তাদের ভারাপ্পন। এমনই সব মায়েরা আজ রাজ্যের নিরাপত্তার দায়িত্বে কেউ পুলিশে, কেউ সেনাবাহিনীতে, কেউ জরুরি পরিষেবায় নিয়োজিত রয়েছে, তাদেরকে কুর্নিশ জানায়। তাঁর যে ভাবে কাজ করে চলেছে তা অতুলনীয়। ধন্যবাদ আপনাদের। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন আপনারা।
