![]() |
| আহমাদ ফরিদ |
বিনয় মানুষের ভদ্রতার পরিচায়ক। একজন ব্যক্তি অভিজাত কিনা সেটা তার বিনয় দেখেই বুঝা যায়। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। সে হিসাবে তাকে যে সমস্ত মানবিক গুণাবলী দেয়া হয়েছে, বিনয় তার মধ্যে অন্যতম। বিনয়ের বিপরীত শব্দ অহংকার। বিনয় বাদ দিলে একজন মানুষ হয় অহংকারী । অহংকারী ব্যক্তির আচরণ আক্রমনাত্মক। মানুষের অফেন্স হলো অহংকার আর বিনয় হচ্ছে ডিফেন্স। আক্রমনাত্মক ব্যক্তি সব সময় অশান্তির খোঁজ করে পক্ষান্তরে রক্ষণাত্মক ব্যক্তি শান্তির অনুকূল।
মানুষ বিনয়ী হবে এটাই স্বাভাবিক, এটাই প্রাকৃতিক সত্য। এজন্য তাকে কৃতিত্ব দেয়ার কিছু নেই। পশু বিনয়ী হলে অবশ্য অবাক হওয়ার বিষয়। বিনয় হচ্ছে মানুষের একটা আচরণগত বিষয়। যে যত সভ্য,বিবেকবান তার আচরণ হবে ততটাই বিনয়ী । বিনয় মানুষকে সামাজিক করে,জনপ্রিয় করে এবং মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব ধরে রাখে। এটা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। পশুদের বিবেক দেয়া হয়নি বলে তাদের বিনয়ী হতে হয় না। ভদ্র কথাটার বিপরীত শব্দ হলো ইতর। কাজেই মানুষকে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হয় বিনয় দিয়ে, ভদ্রতা দিয়ে, যদি সে নিজেকে ইতর হিসাবে দেখতে না চায়। আর যদি কেউ নিজেকে ইতর দলভূক্ত দেখতে চায় তবে তার ভদ্র ও বিনয়ী না হলেও চলবে।
যে মানুষ বিনয়ী সে মানুষ হবে সকল মানুষ এমন কি সকল জীব জন্তুর জন্য একজন নিরাপদ মানুষ। যে মানুষ নিরাপদ তাঁর দ্বারা কোন মানুষ বা অন্য কোন জীবের ক্ষতি সাধিত হতে পারে না।
ইদানিং দেখা যাচ্ছে আমাদের সমাজে পেশী শক্তির প্রাদূর্ভাব যত বাড়ছে, বিনয়ের কদর তত কমছে। এখন আর কেউ বিনয়ী হতে উৎসাহ পায় না। মানুষ এখন বিনয় প্রকাশ করতে ভয় পায়। কারণ এখন বিনয়কে দেখা হয় দুর্বলতা হিসাবে। বিনয়ী ব্যক্তিকে নিরীহ বলে ,ভদ্রলোক বলে কটাক্ষ করা হয়। এখন বেঁচে থাকার তাগিদে পেশীহীন ব্যক্তিও পেশী ফুলানোর ভান করে। বিনয়ের বদলে সমাজটা এখন হুংকারের দিকে ঝুকে যাচ্ছে।
এ সবই হচ্ছে আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে। অবক্ষয় হচ্ছে নিচে নেমে যাওয়া। আমরা মানুষ ছিলাম এখন আমরা নিচে নেমে যাচ্ছি। সেই নিচেটা কোথায়? উত্তর পানির মত সোজা। আমাদের বর্তমান গন্তব্য সোজা পশুত্বের দিকে। যেখানে বিনয়ের বদলে পাশবিকতার চর্চা হয় দিনরাত। মানুষ যদি তার মানবিক বৈশিষ্ট্য হারায় তবে তার পশু হতে বাকি কোথায়? তবে পশু কথাটা শুনতে একটু খারাপ লাগে- এই যা। আমি মানুষ কিন্তু আমার আচরণ পাশবিক-এটা কোন ক্রমেই মানান সই নয়। হয় আমাকে পুরোপুরি মানুষ হতে হবে, নয়তো মানুষ পরিচয় ছাড়তে হবে। মানুষ-পশুর মাঝামাঝি কোন গ্রহণযোগ্য স্তর থাকতে পারে না। রূপকথায় মৎস্য কন্যার উল্লেখ আছে। মৎস্য কন্যাদের অর্ধেক দেহ মানুষের বাকী অর্ধেক মাছের। মানব পশু বা পশু মানব হওয়ার বাস্তব কোন সুযোগ নেই। পশুত্বে আর মনুষত্বে মাখামাখি করে মানুষের কোন গ্রহণযোগ্য পরিচয় দাঁড় করানো যাবে না। কারণ পাশবিকতা আর মানবিকতা দুটোই বিপরীত মুখী প্রবণতা। তাদের গন্তব্য আলাদা। তবে এদের একটা আলাদা পরিচয় অবশ্য আমরা জানি, আর সেটা হলো নরপশু।
কথা হচ্ছিল বিনয় নিয়ে। এক কথায় বিনয় হচ্ছে মানুষ আর পশুর মাঝে পার্থক্যের নির্দেশক। যে যত ভদ্র ,বড় আর জ্ঞানী সে তত বিনয়ী । সমাজ পরিবার ও দেশের শান্তির জন্য বিনয় চর্চার কোন বিকল্প নেই। আসুন আমরা বিনয়ী হই, চিন্তা কথায় ও কাজে। বিনয় আসলেই মানুষকে মহৎ করে। আজকে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যে ঘোর অমানিশায় আমাদের চারপাশ আচ্ছন্ন হয়ে গেছে,সেখান থেকে মুক্তির পথ আমাদেরই বের করে নিতে হবে। প্রথমেই সকল স্তরে বিনয়ের অনুকূল পরিবেশ তৈরী করতে হবে। সমাজে বিনয়ী মানুষকে সম্মান ও উৎসাহ দিতে হবে। বিনয়কে দুর্বলতা হিসাবে দেখার প্রবণতা সকলকেই ছাড়তে হবে। মনে রাখতে হবে বিনয়ের বিপরীত হলো গর্জন তথা ধমক। কোথাও বিনয়ে কোন কাজ হচ্ছে না বলে সবাই গর্জন তথা ধমক অথবা পেশী শক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এটা বিনয়ের জন্য খুবই প্রতিকূল পরিবেশ। সমাজে বিনয়ের কদর না থাকলে মানুষ কেন বিনয়ী হবে ? মানুষের বিনয় হচ্ছে সহজাত আর গর্জন আর্টিফিসিয়াল। সহজাত প্রবণতায় যখন কোন কাজ হয় না তখন মানুষ বাধ্য হয়েই আর্টিফিসিয়াল প্রবণতার আশ্রয় নেয়। সমাজে যখন বিনয়ের কদর থাকে না, তখন সব কিছুই চলে গর্জন তথা ধমকে। যারা বিনয়ী তারা ভদ্র আর তাই তারা গর্জন বা ধমক দিতে জানেন না। আর আমরা সবাই জানি এখন ধমক ছাড়া কোন কাজই হয় না। তবে এখন ধমক ছাড়াও কাজ হচ্ছে,টাকা দিয়ে। এখন সমাজের বিনয়ী লোকদের গর্জন না জানার কারণে মাশুল দিয়ে সব কাজ করাতে হয়। মাশুল কি জন্য? সে বিনয়ী বলে। অর্থাৎ বর্তমান সমাজে বিনয়ী লোকদের শুধুমাত্র বিনয়ী হওয়ার কারনে ঘুষ দিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। তা হলে মানুষ বিনয়ী হবে কি জন্যে? এটা বিনয়ী আচরণের জন্য খুবই প্রতিকূল পরিবেশ। যে সমাজে বিনয় চর্চা নেই সেই সমাজে মানুষের জন্য নিরাপত্তাও নেই।
মানুষ মানুষের ভাই হলে সকল মানুষেরই সকলের জন্য নিরাপদ হওয়ার কথা। নিজে আক্রমনাত্মক হওয়া দূরের কথা, কোন মানুষকে যদি অন্য কিছু আক্রমন করে, তবে তা থেকে তাকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসাই মানুষের কাজ। একজন সাচ্চা মানুষ কখনো অন্য মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কারণ হতে পারেন না। নীতিগতভাবে সকল মানুষেরই সাচ্চা মানুষ হওয়ার কথা। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে সকল মানুষই আর এখন সাচ্চা মানুষ হন না। অবশ্য সকল মানুষই সাচ্চা মানুষ হলে আলাদা করে এই “সাচ্চা” শব্দটার কোন প্রয়োজন পড়তো না। আমাদের চারপাশ এখন অসাচ্চা মানুষে ভরে উঠছে। তাই এখন মানুষই হয়ে উঠেছে মানুষের নিরাপত্তাহীনতার মূল কারণ। নিরাপদ মানুষের সংখ্যা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে।
যেখানে হিংস্্র পশুরা মানুষের নিরাপত্তা হুমকীর একমাত্র কারণ হওয়ার কথা, সেখানে বর্তমানে মানুষেরাই পশুদের পিছনে ফেলে মানুষের আরো ভয়ংকর নিরাপত্তা হুমকীর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন মানুষই মানুষের সবচে বড় শত্রæ, সবচে বড় বিপদ। মানুষের সর্বনাশ করতে হলে এখন আর বাইরের কোন কিছুর আক্রমন দরকার নেই। এখন তারা নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশে মহাব্যস্ত। এখন কোন প্রকার ইন্ধন ছাড়াই মানুষ মানুষের চরম সর্বনাশ করে অবলীলায়। তাই এখন নিরাপদ মানুষের বড় অভাব। দরদী মানুষের মহা অভাব।
যে মানুষ অন্য সকল মানুষের ক্ষতি করবেন দূরে থাক, সেকথা চিন্তা পর্যন্ত করতেও নারাজ তিনিই নিরাপদ মানুষ। তার কাছে সকল মানুষই নিরাপদ। তিনি একজন সাচ্চা ও দরদী মানুষ। আমাদের সমাজের বর্তমান নানা অশান্তির মূল কারণ নিরাপদ মানুষের অভাব। বর্তমান বিশ্বে মানুষই এখন মানুষের সবচে বড় নিরাপত্তা হুমকী। মানুষই আজ ঢাক ডংকা পিটিয়ে দেশে দেশে যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে। কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ? তাদের যুদ্ধ মানুষেরই বিরুদ্ধে। মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এখন এই তথাকথিত যুদ্ধ থামাতে প্রয়োজন বিশ্বের দেশে দেশে নিরাপদ মানুষের উত্থান। প্রয়োজন নিরাপদ মানুষের হাতে নেতৃত্ব। সর্বপ্রথম দরকার নিরাপদ মানুষ হওয়ার কনসেপ্ট সকল মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। নিরাপদ মানুষ আমাদের সমাজে এখনো কিছু কিছু রয়েছেন। তাদের নিয়েই নিরাপদ মানুষ তৈরীর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মানব সভ্যতার অস্তিত্ব এখন বেশী বেশী নিরাপদ মানুষের উপরই নির্ভরশীল।
এক সময় মানুষের নিরাপত্তার জন্য হিংস্্র পশুরাই ছিল সবচে বড় হুমকী। সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে মানুষ পশুদের হুমকীকে জয় করেছে বটে কিন্তু সভ্যতা যত বিকশিত হয়েছে মানুষ ক্রমে নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তার হুমকী হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশুরা নয়, আজ মানুষই মানুষের সকল আতংকের কারণ। কত বিভৎস উপায়ে মানুষকে হত্যা করা যায়, তা নিয়ে সারা পৃথিবী জুড়ে চলছে উৎকট প্রতিযোগিতা। কে কত ভয়ংকর মারণাস্ত্র বানাতে পারে, তা নিয়ে দেশে দেশে কত বড়াই! যেন মানুষ মারার চাইতে ভালো কাজ আর হয় না! মনুষ্যত্ব থেকে মানবের এ এক বড় বিচ্যুতি। সাধারণত পশুরা বিবেকহীন হওয়ার কারণে সারাক্ষণ মারামারি কাটাকাটি করে। কিন্তু মানুষের বিবেক রয়েছে এবং তারা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বলে মারামারি কাটাকাটি মানুষের জন্য শোভনীয় নয়। পশুর স্বভাব মানবে বেমানান। সারা বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের ডামাঢোল আর মারণাস্ত্র তৈরীর স্বগর্ব চিৎকার প্রমাণ করে, সারা বিশ্বে এখন অনিরাপদ মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। মানব সভ্যতা যে আজ চরম বিচ্যুতির মুখে, এতে এটাও প্রমাণিত হয়। মানব সভ্যতাকে এই মহা বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করতে হলে মানুষকে আবার তার আদি অবস্থান, মনুষত্বের পথে রওনা দিতে হবে। মনুষ্যত্বের প্রথম পাঠ হবে “ মানুষ মানুষের জন্যে ”। মানুষ মানুষ মারার জন্য নয়। দ্বিতীয় পাঠ হবে ’সকল মানুষ হবে সকলের কাছে নিরাপদ’। কোন মানুষের ক্ষতি না করার সংকল্প এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। অন্যের ক্ষতির চিন্তা না করাই নিরাপদ মানুষ হওয়া। মানুষের এ জন্য প্রয়োজন একটা উদার মন। নিরাপদ মানুষ হতে গেলে দৃষ্টিভঙ্গিতে উদারতা আনতে হবে। এজন্য মানুষের ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট। আসলে অন্যের ক্ষতি করে মানুষের জন্য কোন লাভই নেই। এটা স্্েরফ একটা মানসিক দীনতা। মানুষ প্রকৃতিগত ভাবেই প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী। তাকে কোন প্রকার দীনতায় মানায় না। আসলে বিনয়ী আচরণের নিরাপদ মানুষ হওয়াটাই মানুষের জন্য স্বাভাবিক। মানুষ যদি তার আত্মমর্যাদাবোধের বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকে এবং সে যদি মনুষ্যত্ব থেকে বিচ্যুত হতে না চায়, তবে তাকে অবশ্যই একজন বিনয়ী ও নিরাপদ মানুষ হতে হবে। নইলে শুধু শুধু তার মানুষ দাবী নিরর্থক।।
আপনি কি গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস,ফিচার, গবেষণা মূলক লেখা লেখেন। তাহলে আপনার অপ্রকাশিত লেখা টাইপ করে (বাংলা মোবাইল ফ্রন্ট অথবা অভ্র ফ্রন্টে) পাঠিয়ে দিন আমাদের দপ্তরের হোয়াটস্অ্যাপ নম্বরে 7003345558।
সঙ্গে আপনার ছবি ও পরিচয়। প্রতিদিনই লেখা পাঠাতে পারেন। নির্বাচিত লেখা প্রকাশ হবে আমাদের পোর্টালে প্রতি সপ্তাহের শনিবার ও রবিবার।
আপনি কি ছবি তুলতে বা ছবি আঁকতে ভালোবাসেন তাহলে আপনার আঁকা বা তোলা ইউনিক ছবি ক্যাপশন সহ পাঠিয়ে দিন আমাদের দপ্তরের ইমেল-এ (bbplive.news@gmail.com) । আমরা প্রকাশ করবো আপনার আঁকা বা তোলা অপ্রকাশিত ছবি।
