![]() |
| সৈয়দ খুকুরানী |
ঠিক এই সময়টাতে,
লক্ষী পূজোর আগের দিন
আমি, দার্জিলিং গভমেন্ট কলেজের ওদিক টাতে হাটছিলাম,
কখনো ধোবি গাছটার গা ঘেঁষে, কখনো ঘন কুয়াশা এসে আমার দৃষ্টি আবছা করে দিচ্ছি লো।
একজন ভদ্রলোক, আমার পিছনে, হন হন করে আসছিলেন।
বললেন এই শহরে, আপনি নতুন বুঝি,
হ্যাঁ। আপনি?
এই যে গভমেন্ট কলেজ, এখানে আমি পড়াই।
বাহ।আমি রোজ এই পথ দিয়ে হাটি।
আপনার সাথে আর কে আছে?
আমার স্বামী।
তিনি কোথায়?
ঐ যে ভানু ভবন। পুলিশ কন্ট্রোল রুম।
উনি কখন ফাকা থাকেন।
কখনো না। কোনোই ঠিক নেই।
যুদ্ধ চলছে। গোর্খাল্যান্ড এর যুদ্ধ। কখন যে কি হয়।
পুলিশের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই।
জানেন, আমার কেমন যেন লাগে, মানুষের সাথে মানুষের যুদ্ধ, দেশের জন্য যুদ্ধ। যতো অশান্তি।
অথচ আমি জি এন এল এফ এর কনভেনর এর বাড়িতেই থাকি।
স্বামী র কথা আনটি কে বলিনা।
আনটির কথা স্বামী কে বলিনা।
আমি নেপালী ভাষা বুঝিনা। ঐ ভাষায় কথা ও বলতে পারিনা,
আনটির একটিই ছেলে, কাঠমান্ডু, পোখরা ই থাকতেন।
চলছে গুলি গালাজ।
রাত দুপুরে গটগট করে স্বামী ঢুকলেন ঘরে,
হ্যালো টাইগার হ্যালো, একটা কি যেন সঙ্কেত। মুহূর্তে বেরিয়ে গেলেন।
পরের দিন, আনটি বাড়ী নেই। অফিসে। আমার ঘরেই ছেলে টি।
না আমি, তার কোনো কথার উত্তর দিতে পারিনি।
কিন্তু বাঙ্গালী মেয়ে, লক্ষী পূজার আগের দিন,
তাকে কেমন করে এড়িয়ে যায় বলুন।
আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি রাখিনি।
শুধু বলে গেল, নেপালী ভাষায়, আমার মা কে বলবেন আমি এসেছিলাম। আমি সেখানে নিরাপদ এ আছি।
বিশ্বাস করুন এর একটি কথা ও স্বামী কে বলিনি।
ডিউটি সেরে ভোরের দিকে স্বামী বাসায় ফিরে আসেন।
সেদিন সকালে, গভমেন্ট কলেজ এর অধ্যাপক সাহেব নিজে এসে বলে গেলেন
আজ যেন একটি বার,
আমরা উনার বাড়ি তে যায়।
উনারা অপেক্ষা করবেন।
স্বামী কে বলায়, তিনি বললেন
তুমি যাও,
পূর্নিমা র চাদ দেখো, নাড়ু খাও, খিচুড়ি খাও। আরো যা ইচ্ছা করো। যা ইচ্ছা।
আমার ডিউটি আর পাচটা মানুষের মতো নয়।
কেন বুঝতে চাও না?
আমি বলি, টাইগার মানে কি?
উনি চেচিয়ে বললেন, তুমি আমার ডিপার্টমেন্ট এর ব্যাপারে জানতে চেয়োনা আর কখনো ;
আমি বলেছিলাম, পাচটা মিনিট সময় দিতে পারবেনা?
ভদ্রলোক মনে কষ্ট পাবেন।
তোমার ভালো লাগে না,
পাহাড়ের চূড়ায় গোল সোনার থালার মতো, পূনিমা র চাদ।
ঘরে ঘরে লক্ষী পূজার আয়োজন,
গোটা পাহাড় জুড়ে শুধু ই আলো।।
কিচ্ছু দেখতে ইচ্ছা করেনা? দেশবন্ধু লাইব্রেরী জুড়ে থরে থরে সাজানো ব ই। আমি কোনো কোনো নির্জন দুপুরে আমি ওখানে কতদিন ঢুকে পড়ি।
তোমার কখনো ইচ্ছা করেনা
আমার মতো লাইব্রেরী তে যেতে।
উনি বললেন উচ্চ কনঠে
তোমার বাপকে বলতে হোতো
কোনো কবি, সাহিত্যিক এর সাথে তোমার বিয়ে দিতে।
মনে রেখো আমি এখানে আত্মীয়তা করতে আসিনি।
সামান্য ভূলের জন্য আমাকে
সুপীরিয়র কে জবাব দিহি করতে হবে।
এমন ই এক লক্ষী পূজার দিনে, অধ্যাপক সাহেবের সহধর্মিনী আমার স্বামী কে, কি যে যত্ন করে, লুচি তরকারি, খিচুড়ি, যাবতীয় সব খাবার খাইয়ে, প্রনাম করে বললেন, এখানে আমাদের সে রকম কেউ চেনা নেই। দুজন মানুষ। আপনারা আসায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি।
আসার পথে দড়াম দড়াম করে, গুলি র শবদ।
রিঙ সিনেমা হলের ওখানে একটি বুদধিষট মহিলা, মালা জপতে জপতে যাচ্ছিলেন,
তিনি বললেন, আপনি ধীরে হাটুন। হাপিয়ে যাচ্ছেন। অনেক সিড়ি ভেঙ্গে তবেই স্বামীপরভূদাননদ রোড।
আমার স্বামী সরকারি ডিউটি তে ছুটলেন।
আমি নেপালী ভাষায় কথা বলতে না পারলেও
পরম নির্ভরতা য়, নিসঙকোচো উনার সাথে বাসায় ফিরলাম।
দেখি নেপালী আঙকেল আমার অপেক্ষা য়, দরজা য় দাড়িয়ে।
আলোর মালায় পাহাড় সেজেছে।
নেপালী ছেলেটি কথা বলতে পারে না, সে আমার কপালে টিকা লাগিয়ে দিল।
আনটির মেয়ে ছিল না।
আমায় বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
বললেন আমি যেন পুলিশের ইউনিফর্ম টা ঘরে লুকিয়ে রাখি।।
আজ সেই আকাশ আছে। চাদ আছে। ঘরে ঘরে লক্ষী পূজা হয়। ভালো বাসার মানুষ গুলো হারিয়ে গেছে।
হৃদয়ের অনেক খানি জায়গা জুড়ে আছেন তাঁরা।
যুদ্ধ মানুষকে বড়ো বিচ্ছিন্ন করে দেয়। নষ্ট করে দেয় সব।

